বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কন্ঠস্বরের কাছে মহানায়কের জনপ্রিয়তাও ফিকে! জানেন কি হয়েছিল ?

0
224

পল্লবী সান্যাল : মহালয়ার ভোরে রেডিওতে কান পাতলেই শোনা যায় আকাশবাণী সম্প্রচারিত মহিষাসুরমর্দ্দিনী। যার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন এক কৃতী বাঙালি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। যাঁর কন্ঠে বিশুদ্ধ সংস্কৃত উচ্চারণে শ্লোক পাঠ শুনতেই অভ্যস্ত বাঙালি। ১৯৩২ সালে মহিষাসুরমর্দ্দিনীর সরাসরি সম্প্রচার শুরু হওয়ার পর আকাশবাণী কর্তৃপক্ষের এক হঠকারী সিদ্ধান্তে আচমকাই অনুষ্ঠানের তাল কাটে ১৯৭৬ সালে। কয়েক বছর ধরে একইভাবে সম্প্রচারিত হয়ে আসা মহিষাসুরমর্দ্দিনীর একঘেয়েমি কাটাতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের জায়গায় আসরে নামানো হয় মহানায়ক উত্তমকুমারকে। অনুষ্ঠানের নামকরণ করা হয় ‘দুর্গতিহারিণী’। যার চিত্রনাট্য লিখেছিলেন ধ্যানেশ নারায়ণ চক্রবর্তী। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে সেদিন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কন্ঠস্বরের কাছে সুপার ফ্লপ হয়েছিল বাঙালির প্রিয় নায়কের কন্ঠস্বরে মহালয়ার স্তোত্রপাঠ। অথচ সেবার মহিষাসুরমর্দ্দিনীকে নতুন আঙ্গিকে তুলে ধরার জন্য কোনও খামতিই রাখেনি আকাশবাণী কর্তৃপক্ষ।কি ছিল না। উত্তম কুমারের কন্ঠ ছাড়াও আকর্ষণের কেন্দ্রকিন্দুতে ছিলেন লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, মান্না দে, বসন্ত চৌধুরীর মতো কলকাতা ও মুম্বইয়ের জনপ্রিয় সব শিল্পীদের গাওয়া গান। এছাড়াও অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন বাচিক সিল্পী পার্থ ঘোষ ও গৌরী ঘোষ সহ ততকালীন সংবাদ পাঠিকা ছন্দা সেন। ছিলেন নামী স্ত্রোত্র গায়িকা মাধুরী মুখোপাধ্যায়ও। কিন্তু তিনিও বাঙালির মন জয় করতে ব্যর্থ হয় সেদিন। অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ব্যর্থ হওয়ায় তার জনপ্রিয়তা, ঐতিহ্য বজায় রাখতে আকাশবাণী কর্তৃপক্ষকে ফিরিয়ে আনতে হয়েছিল বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রকে। এর থেকেই বোঝা যায় মহানায়কের মতো মহালয়ার ভোরে আকাশবাণী সম্প্রচারিত মহিষাসুরমর্দ্দিনীরও আলাদা একটা গ্ল্যামার রয়েছে। সেই থেকে আজও আকাশবাণীতে সম্প্রচারিত হয়ে আসছে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কন্ঠে মহিষাসুরমর্দ্দিনী। বাঙালি তা শুনছেও সাগ্রহে।

বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র ছিলেন একাধারে একজন বেতার সম্প্রচারক, নাট্যকার, অভিনেতা ও নাট্যপরিচালক। তাঁর জন্ম উত্তর কলকাতার মতুলালয়ে। ১৯০৫ সালের ৪ আগাস্ট তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন রায়বাহাদুর কালীকৃষ্ণ ভদ্র। যিনি ছিলেন বহু ভাষাবিদ। ১৪ টি ভাষা জানতেন। নিম্ন আদালতে দোভাষীর কাজ করতেন তিনি। পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যের জগতে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক পরিচিত ব্যক্তিত্ব। মা ছিলেন সরলাবালাদেবী। কর্মসূত্রেই কালীকৃষ্ণ ভদ্রের সঙ্গে সরলাবালাদেবীর পরিচয় গড়ে ওঠে। সরলাবালাদেবী ছিলেন বিশিষ্ট আইনজীবী কালীচরণ ঘোষের দ্বিতীয় সন্তান। পরবর্তীকালে ৭, রামধন মিত্র লেনে তাঁর ঠাকুমা যোগমায়া দেবীর বাড়িতে সপরিবারে বসবাস করতে শুরু করেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। ১৯২৬ সালে ইন্টারমিডিয়েট ও ১৯২৮ সালে কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজ  থেকে স্নাতক হন তিনি।একাধিক ধ্রুপদি কাহিনিকে বেতার নাট্যের রূপ দেন। ১৯৩০-এর দশকে তিনি যোগ দেন অল ইন্ডিয়া রেডিওয়। কর্মজীবনের শুরুতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে চাকরি করলেও বেতারের প্রতি ছিল তাঁর অদম্য টান। সেই টানের জোরেই আজও তিনি রয়ে গিয়েছেন বাঙালিদের মনের মণিকোঠায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here