স্মৃতির স্মরণী বেয়ে একুশের ইতিহাস

0
103

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ সালটা ১৯৯৩ আর দিনটা ২১ শে জুলাই নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনার জন্য সচিত্র পরিচয়পত্র অর্থাৎ ভোটারকার্ড চালু করার দাবিতে তৎকালিন যুব কংগ্রেসের নেত্রী তথা বর্তমান বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে মহাকরণ অভিযানের কর্মসূচি নিয়েছিলেন। উপস্থিত ছিলেন বর্তমান তৃণমূল সাংসদ, বিধায়ক সহ বহু বিশিষ্ট নেতৃত্ব। তখনও গঠন হয়নি সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস। পশ্চিমবঙ্গ যুব কংগ্রেসের ‘আগুনে নেত্রী’ তথা সভাপতি তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলার তৎকালিন শাসকদল সিপিআইএমের অপশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই চালাচ্ছিল প্রদেশ কংগ্রেস। ২১শে জুলাই মমতা বন্দোপাধ্যায়ের এই বিক্ষোভকে ঘিরে উত্তাল হয়ে ওঠে মহানগরী।

১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই মমতার ডাকে মহাকরণ অভিযানের জন্য কলকাতার রাজপথে নামেন কয়েক হাজার যুবকংগ্রেসকর্মী। রাজ্যের প্রধান প্রশাসনিক সচিবালয়ে এই অভিযান রুখতে তৎপর হয় পুলিশ। বিভিন্ন ক্রসিং-এ গড়া হয় ব্যারিকেড।  যুব কংগ্রেস কর্মীরা কলকাতার পাঁচটি অঞ্চলে জমায়েত হন। তাঁরা সকলে ব্রেবোর্ণ রোড ধরে এগোতে শুরু করেন মহাকরণের উদ্দেশ্যে। এক বিশাল পুলিশ বাহিনী তাঁদের পথরোধ করে টি-বোর্ডের অফিসের কাছে। এই মিছিল রোধের জন্য পুলিশের তরফে শুরু হয় লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়া। এমনকি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও রেয়াৎ করেনি পুলিশ। এরপরই বিক্ষিপ্ত মিছিলের ওপর হঠাৎ চলতে থাকে গুলি। মুহূর্তের মধ্যেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন কর্মীরা। সেই গুলিতে মুহূর্তের মধ্যেই প্রাণ কাড়ে ১৩ জন যুবকংগ্রেস কর্মীর এবং আহত হন শতাধিক কর্মী। শহিদ- বন্দনা দাস, মুরারী চক্রবর্তী, রতন মণ্ডল, কল্যান বন্দ্যোপাধ্যায়, বিশ্বনাথ রায়, অসীম দাস, কেশব বৈরাগী, শ্রীকান্ত শর্মা, দিলীপ দাস, রঞ্জিত দাস, প্রদীপ দাস, মহম্মদ খালেক, ইনুদের রক্তে মাটি ভেজে।প্রায় দুই দশক ধরে প্রতিবছর এই দিনকে স্মরণে রেখে ১৩ জন কংগ্রেস কর্মীর শহীদ পরিবারকে শ্রদ্ধা জানাতে মঞ্চ প্রস্তুত হয়  ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে। শহীদ দিবসের সভামঞ্চ থেকে শ্রদ্ধার্ঘ্য জানাতে হাজির হন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃনমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দোপাধ্যায়। একুশের মঞ্চই সাক্ষী থেকেছে যে কীভাবে  তৃণমূলে ১৯৯৩ সালের পর থেকে প্রতিবছর এই দিন ‘শহিদ তর্পণ’ হিসেবেই পালন করে আসা হচ্ছে। প্রতিবছর ২১ জুলাইয়ের মঞ্চে দলীয় কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশ্যে দলের আগামী দিনের রণনীতির বার্তা দিয়ে থাকেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলার রাজনীতিতে এই দিনটিকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবই দেখে রাজনৈতিক মহল। বাম জমানায় বিরোধী মুখ হিসেবে মমতার উত্থানের পিছনেও ২১ জুলাই অন্যতম।

১৯৯৩ সালের এই ঘটনার পর থেকেই প্রতিবছর এই দিনটিকে ‘শহিদ দিবস’ হিসেবে পালন করে পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেস। পরবর্তীকালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূল তৈরি করেন এবং ২১ জুলাইকে ‘শহিদ দিবসে-র মর্যাদা দেওয়া হয়। আজও এই দিনে পৃথকভাবে সমাবেশ করে কংগ্রেস। কিন্তু, তৃণমূল রাজনৈতিকভাবে এ রাজ্যে বৃহত্তর শক্তি হয়ে ওঠায় তৃণমূলের ‘শহিদ দিবস’ই যাবতীয় আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। এই ১৩ যুবকংগ্রেসকর্মীর মৃত্যুতে রীতিমতো উত্তাল হয়ে ওঠেছিল রাজ্য রাজনীতি। কার নির্দেশে গুলি চালাল পুলিশ, এই প্রশ্নের আজও মীমাংসা হয়নি। উল্লেখ্য, সেসময় রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদে ছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। তবে পরবর্তীকালে এ ঘটনায় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে ক্নিনচিট দেয় সিবিআই। তবে করোনার জেরে এবছর ২১ জুলাইয়ের চিএটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। করোনার থাবায় একেবারে বদলে গিয়েছে সমাবেশের আয়োজন। আগেই তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছিলেন এবার ধর্মতলায় শহীদ দিবসের সমাবেশ হবে না। তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ধর্মতলায় শহীদ বেদীতে মাল্যদান করা হবে। প্রথমবারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আজ ভার্চুয়াল জনসভা থেকে বক্তব্য রাখবেন। অন্যদিকে বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে বিধানসভা প্রত্যেক এলাকায় সামাজিক দূরত্ব বিধি মেনেই শহীদদের শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করবেন নেতা-কর্মীরা।  আজ দুপুর ১টায় প্রতি বুথে ২৫ জন জমায়েত হবে। তারপর ঠিক ২টোয় কালীঘাটে নিজের বাসভবনের‌ দলীয় কার্যালয় থেকে বক্তব্য রাখবেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রতি বছর ধর্মতলা থেকে মুখ্যমন্ত্রীর ভাষণ আলাদা অক্সিজেন জোগায় দলের নেতাকর্মীদের। এছাড়াও এইদিন দলের সারা বছরের কর্মসূচি ঘোষণা করেন তৃণমূল নেত্রী। এক্ষেত্রে আজ দলনেত্রী কী নির্দেশ দেন তার জন্য অপেক্ষা করছে দলের কর্মী- সমর্থকরা। এখন দেখার বিষয় এরাজ্যের বিজেপির ভার্চুয়াল জনসভাকে কতটা টক্কর দিতে পারেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here