সঙ্গীতশিল্পী ‘পিউ মুখার্জি’-র আলোর উৎসব…

0
68

নিজস্ব প্রতিনিধি (দেবস্মিতা ঘোষ) ১৪.১১.২০২০

“যদি বা প্রাণ যায় যেন না গান যায়”- শ্রীজাত দার লেখা এই লাইন গুলো  নিজের জীবনে যিনি সত্যি করে তুলেছেন তিনি হলেন পিউ মুখার্জি।তানসেনের তানপুরায় আমরা দ্বৈত কণ্ঠে শুনেছি এই গান।মহিলা কণ্ঠ শিল্পী হিসেবে এই গানে ছিলেন স্বয়ং তিনি।পিউ মুখার্জি একটি রিয়ালিটি শোয়ের পর তাঁর আত্মপ্রকাশ করেন।সেই শো এ তাঁর শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ওপর দখলের জন্য তিনি মন কেড়ে নেয় হাজার হাজার দর্শকের।তাঁর সাধনা ও গায়কীর জন্য “মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি”তে আত্ম পরিচিতি লাভ করেছেন।সত্যিই গানকে তিনি ভালোবেসেছেন তাঁর জীবন দিয়ে…সঙ্গীত হয়ে গেছে তাঁর কাছে জীবনের চেয়েও দামী।মূলত সঙ্গীতশিল্পীরা এই উৎসবের মরশুমে ব্যস্ত থাকেন শো নিয়ে ।কিন্তু এই বছর এই মহামারীতে কি করছেন তিনি?দুর্গাপুজো শেষ….আসন্ন বাঙালির আরও এক উৎসব কালীপুজো ।কি ভাবে কাটাবেন তিনি এই আলোর উৎসব?সংবাদ টিভির সাথে খোলা মনে কিছু কথা ভাগ করে নিলেন পিউ মুখার্জি ।

প্রঃ- অন্য বছর কালীপুজো কিভাবে কাটান?

উঃ- আমাদের বাড়িতে কালীপুজোর দিন লক্ষ্মী পুজো  হয়। যেটাকে আমরা বলে থাকি অলক্ষী বিদায় পুজো ।সুতরাং সেই পুজোর একটা বিশাল আয়োজন থাকে ।এছাড়াও পুজোর আগের দিন নিয়ম করে চোদ্দ শাক খাওয়া, ১৪ প্রদীপ দেওয়া হয় ।সেই নিয়ম গুলো চলে আসছে বহুদিন ধরে। সেটা আমিও বজায় রাখার চেষ্টা করি ।সারা বাড়ি সুন্দর করে সাজাই প্রদীপ দিয়ে।আমি ইলেকট্রিক আলো অতটা পছন্দ করি না।মাটির প্রদীপ ও রঙ্গোলি দিয়ে বাড়ি সাজাই।কারণ আমরা উৎসব প্রিয় ও আলোর জাঁকজমকটা সবাইয়ের ভালো লাগে।কিন্তু আবার কোনো কোনো সময় কালী পুজোতে বাইরেও প্রোগ্রাম পড়ে যায়। এছাড়াও বাজি পোড়ানো হয়। যদিও আমি বাজি পোড়াই না ।তবে অন্যরা পোড়ায় সেটা আমি খুব এনজয় করি ।তবে আমাদের বাড়িতে শব্দবাজি আসেনা।

আরো দেখুন

প্রঃ- এবছর কালী পুজো কিভাবে কাটাবেন?

উঃ- এবছর কালী পুজোতে আমার বাড়ির পুজো যথাসম্ভব ছোট করে করার চেষ্টা করবো ।এবং সমস্ত রকমের সাবধানতা অবলম্বন করার চেষ্টা করব ।নমঃ নমঃ  করে পুজো করা যাকে বলে সেটাই করা হবে । এমনি এবছর বাজি পোড়ানো নিষিদ্ধ করে দিয়েছে ,তৎসত্ত্বেও এমনিতেও বাজি পোড়তাম না ।তার কারণ বাজি থেকে যে বায়ু দূষণ হয় সেটা এই করোনা রোগীদের জন্য খুবই ক্ষতিকারক ।যাদের  ফুসফুস ও হৃদযন্র দুর্বল তাদের সংক্রমণের সম্ভাবনা অনেক বেশি। তাই যাদের অসুবিধা আছে , করোনা হওয়ার চান্স যাদের অনেক বেশি ,তাদের জন্য সেটা খুবই ক্ষতিকারক ।তাই শুধু আমি না, আমি সবাইকে বলব যে অন্য বছর উৎসবগুলো যাতে আনন্দে কাটাতে পারি সেই কারণে এ বছর বাজি না ফাটিয়ে কালীপুজোটা কাটাই ।সমাজের সকলের ভালো ভেবে।

আরো দেখুন

প্রঃ- অন্য বছর তো কালীপুজোয় অনুষ্ঠান নিশ্চয়ই থাকে। এবছর কি কোনো প্রোগ্রাম হচ্ছে?

উঃ- আগেই বললাম আমার বাড়ি কালীপুজোর দিন লক্ষী পুজো হয়। সেই কারণে প্রত্যেক বছর খুব শো করা হয় না।তবে হ্যাঁ কিছু কিছু বছর বাইরে থাকতে হয় শো এর জন্য ।আর টেলিভিশনের বৈঠকি আড্ডা গুলো তো অবশ্যই থাকে ।

প্রঃ- কালীপুজো ,দুর্গাপুজো বা অন্যান্য উৎসবে আপনাদেরতো মঞ্চ থাকে। এবছর মঞ্চ বন্ধ। মঞ্চকে কতটা মিস করছেন?

উঃ- অনেকেই হয়তো জানেন আমার আত্মপ্রকাশ একটি রিয়েলিটি শো এর মাধ্যমে। সেটা হয়েছে গত পাঁচ বছর। তার আগে আমি সঙ্গীত চর্চা করেছি কুড়ি থেকে পঁচিশ বছর ।আমার একদম ছোটবেলা থেকেই আমি সংগীতচর্চার সঙ্গে যুক্ত। রিয়েলিটি শো করার আগে আমি যে খুব বেশি মঞ্চে অনুষ্ঠান করতাম তা নয়। করতাম তবে কম ।রিয়েলিটি শো তে আত্মপ্রকাশের পর আমার প্রোগ্রাম অনেক বেশি বেড়ে গেছে ।তাই শুধুমাত্র মঞ্চ উপস্থাপনা নিয়েই আমার সংগীত জীবন নয়। আমি রেওয়াজ করে ,গান শিখিয়ে ,নতুন গান শিখে, গান সংক্রান্ত সেমিনার অ্যাটেন্ড করে ,গান বিষয়ক পড়াশোনা করে ,কিন্তু অনেক সময় কাটাতে পারি।

এগুলোর মধ্যে থেকেও অনেক কিছু পাওয়া যেতে পারে। তবে হ্যাঁ মঞ্চে প্রোগ্রাম করে মঞ্চে অনুষ্ঠান করে দর্শক-শ্রোতাদের যে স্বতস্ফূর্ত ভালোবাসা ,যে রিয়াকশন টা পাওয়া যায় সেটা খুব মিস করছি ।সেটার জন্য অনেকটা  অপূর্ণতা থাকছে। কারণ মঞ্চে প্রোগ্রাম করার পর দর্শকদের থেকে একটা খুব ভালো সাড়া পাওয়া যায় তখন একটা শিল্পীর পূর্ণতা প্রাপ্তি হয়। তবে আমি রেওয়াজ নিয়ে সময় কাটাতে পারি বলেই স্বার্থপরের মতো বলবো না যে মঞ্চ এখন শুরু না হওয়া ভালো ।কারণ বহু মানুষের রুটিরুজি এর উপর নির্ভর করে আছে- যারা আয়োজক, যারা লাইটে আছেন, যারা সাউন্ড করেন তারা খুবই দুরবস্থার মধ্যে আছে। এছাড়াও মঞ্চ থেকে প্রোগ্রাম করে ফেরার সময় একটা শিল্পী একটা প্রশান্তি নিয়ে ফিরে যে এতগুলো মানুষ আমার গান ভালো বললো। এতগুলো মানুষ আমায় এই গানটা গাওয়ার জন্য অনুরোধ করলো …এটা একটা আনন্দ দেয় । অনেকগুলো গান আমার রিলিজ করেছে ২০২০ সালে, সেগুলো কবে মঞ্চে শোনাতে পারবো বা বহু শ্রোতা হয়তো অপেক্ষা করে আছেন কবে সেই গানগুলো মঞ্চে শুনতে পারবেন ।এইসব নিয়ে মঞ্চে ফেরার একটা উন্মাদনা থাকবে ।সেটা অবশ্যই রয়েছে….

আরো দেখুন

প্রঃ- কালীপুজোর একদিন বাদেই ভাইফোঁটা সেদিন কি করবে? আর জগদ্ধাত্রী পুজো বা কিভাবে কাটাবেন?

উঃ- আমার নিজের কোনো ভাই নেই। তবে পরে বহু মানুষ এতো আপন হয়ে গেছে,এতো কাছের হয়ে গেছে,তাদেরকে ভাইফোঁটা দিই। কিন্তু এ বছর বিশেষ করে আমার বাড়ির প্রবীণ এবং তাদের বাড়ির প্রবীনদের কথা ভেবে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য বাড়ি এসে আর ফোঁটা দেয়া হবে না ।তাতে আন্তরিকতার কোনো অভাব থাকবে না ।ফোনেই শুভেচ্ছা বার্তা পাঠানো হবে।

আর আমি যে জায়গাতে থাকি সেখানে জগদ্ধাত্রী পুজোর জাঁকজমক খুব একটা হয় না। তবে আমার বাড়ির কাছাকাছি একটা মন্দির আছে সেইখানে এই বছর অঞ্জলি দিতে যাবো মায়ের কাছে। এমনই ইচ্ছে আছে ।

প্রঃ- ডিজিটাল প্রোগ্রাম করে অনেকেই বলছে শ্রোতাদের ফ্রিতে গান শোনার একটা অভ্যাস তৈরি হয়ে যাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে কি বলবেন আপনি?

উঃ- এবছর করোনার কবলে প্রচুর শিল্পী ডিজিটাল প্রোগ্রাম করছে ।আমাদের প্রোগ্রামের যে ধারা তার একটা বিশাল অদল বদল হয়েছে ।এর ফলে সঙ্গীত মহলে একটা প্রশ্ন উঠেছে যে ফ্রিতে কি বেশি গান শুনিয়ে দিচ্ছেন শিল্পীরা? তবে শ্রোতা বন্ধুদের কথা যদি বলি তারা তো অবশ্যই কিছুটা  অভ্যস্ত হয়ে গেছেন কারণ প্রচুর ফেসবুক লাইভ এবং অনুষ্ঠান হয়েছে এই সময়। কিন্তু আমাদের মাথায় রাখতে হবে এটা খুব কম সময়ের ব্যাপার না । তাই কোনো অর্থনৈতিক বিনিময় এখানে হচ্ছে না। এর ফলে যারা কণ্ঠশিল্পী তাদের বিশেষ অসুবিধা না হলেও  সহযোগী শিল্পী যাঁরা অর্থাৎ আলোকসজ্জা শিল্পী , যন্ত্রশিল্পী ,শব্দ প্রক্ষেপণ শিল্পী তারা ভীষণ অসুবিধার মধ্যে পড়েছে অর্থনৈতিকভাবে। তাই সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করে যদি এই অনুষ্ঠানগুলো করা যায় তাহলে সব শিল্পীদের উপকার। মহামারীর আগে এই প্রোগ্রামগুলো একটা সুন্দর অর্থনৈতিক সঞ্চালনার মধ্যে দিয়েই হত ,যেখানে অর্থনৈতিক ভাবে উপকৃত হতেন শিল্পীরা এবং গানের গীতিকার ও সুরকার, যে স্টুডিওতে কাজ হচ্ছে সেখানের মানুষরা এবং সব্বাই যারা এই কাজটার সঙ্গে যুক্ত থাকতো আর্থিক উপার্জন করতে পারতেন। আমি এন্টারটেনমেন্ট জগতের এক সদস্যা হিসেবে মনে করি এই অর্থনৈতিক সার্কুলেশনটা খুবই জরুরী।আমি নিজেও প্রথম দু’তিন মাস লাইভ ও ডিজিটাল প্রোগ্রাম করার পর  ঠিক করি আমি আমার যন্ত্রানুসঙ্গীত শিল্পী এবং শব্দ প্রক্ষেপণ শিল্পী ছাড়া কাজ করবো না। তাই আমার মনে হয় সমস্ত ব্যাপারটা আগের মতন সুষ্ঠুভাবে হওয়ার জন্য আমাদের শিল্পীদেরই চেষ্টা করতে হবে।

 প্রঃ- এখন তো এত ইউটিউব রিলিজ হচ্ছে ।এছাড়া বৈঠকি আড্ডা হচ্ছে । শুটিং ফ্লোরে যেতে হচ্ছে এবং শুটিং করতে হচ্ছে সে ক্ষেত্রে,কি সাবধানতা অবলম্বন করা হচ্ছে?

উঃ- শুটিং ফ্লোর স্যানিটাইজ হচ্ছে। মেকআপ রুম স্যানিটাইজ করা হচ্ছে। কিন্তু বহু সময় সেরম ভাবে সতর্ক আমরাই থাকতে পারছি না  কারণ এই নিউ নর্মালে এখনো আমরা ঠিক অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারিনি ।তাছাড়া মেক আপের সময় যখন চুল সেট করা হচ্ছে সে সময় আমরা মাস্ক পড়ে থাকতে পারছি না। 

শুটিং ফ্লোরে ও আমরা মাস্ক পড়তে পারছি না ।যদিও আর্টিস্টরা ছাড়া বাকি কলাকুশলীরা মাস্ক পড়ছেন ।তাই রিস্ক নেই সেটা বলতে পারবো না ,তবে কিছুটা লাকের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে ।যতটা সম্ভব সাবধানতা অবলম্বন করছি ।ফিরে এসে শুটিংয়ের ড্রেসগুলো কে আলাদা করে রাখা হচ্ছে ।ড্রাই ওয়াশে পাঠানো হচ্ছে ।পুরো গরম জলে স্নান করছি। নিজে সতর্ক  থাকছি, কিন্তু এর পরেও কিছু হলে সেটা দুর্ভাগ্য বলেই জানবো।

প্রঃ- তানসেনের তানপুরা নিয়ে কী বলবেন?

উঃ-এবছর সব কাজের মধ্যে এটা আমার বড়ো প্রাপ্তি। শ্রীজাতদা ও জয় (সরকার)দা এরম দুজন মানুষের সঙ্গে কাজ করা এবং ওনারা যে আমাকে ভেবেছেন এই কাজটার জন্য তার জন্য ওনাদেরকে অনেক ধন্যবাদ । “তোমাকে ভালোবেসে” গানটা আমাকে প্রচুর দর্শকের কাছে পৌঁছে দিয়েছে এবং তোমাকে ভালোবেসে যে গানটা আমি আর জীমূত গিয়েছি তা প্রচুর মানুষের মন জয় করেছে। তাই আমি শ্রীজাত দা ও জয়দার কাছে এর জন্য কৃতজ্ঞ থাকবো।

 প্রঃ- সবশেষে জিজ্ঞস করি আপনার দর্শকদের জন্য কি বলবেন?

উঃ- বলবো আমাদের আনন্দের কারণ যাতে অন্য কারোর নিরানন্দের কারণ  না হয়ে যায়। কালীপুজো পালন করুন তবে এ বছর বাজির আনন্দটাকে দূরে রাখাই ভালো।  যারা অসুস্থ বা হার্টের রোগী তাদের জন্য এটা আরও ক্ষতিকারক এবং তাদের করোনা হওয়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যাবে। তাছাড়া করোনার সঙ্গে যারা যুদ্ধ করছেন তাদের জন্য এই দূষিত বায়ু খুবই ক্ষতিকর। তাই সমাজের প্রত্যেকের কথা ভেবে এবছর এই আনন্দ থেকে নিজেকে বঞ্চিত রাখাই ভালো ।আরো বলবো শব্দবাজি একেবারেই নয় আমি প্রত্যেক বছর এই কথাটা বলে থাকি যে শব্দবাজি অনেকের জন্য খুব ক্ষতিকারক ,অসুস্থ মানুষ, বয়স্ক মানুষ ,ছাড়াও পশুপাখি এদের জন্য খুবই ক্ষতিকর। বিশেষ করে কুকুর, যাদের শ্রবণশক্তি প্রবল তাদের কাছে এটা খুবই দুর্বিষহ হয়ে ওঠে ।তাই সেটা করবেন না ।সবাই সাবধানে ,সুস্থভাবে স,তর্ক থেকে এবছরের কালীপুজো পালন করুন। সবাইকে অনেক শুভেচ্ছা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here