ভারতীয়দের দুঃখ, দুর্দশা ঘোচাতে সাংবাদিক গান্ধীর অবদান

0
314

পল্লবী সান্যাল : সংবাদ মাধ্যমই পারে একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে। এই চিন্তা ভাবনা থেকেই কলম ধরেছিলেন মহাত্মা গান্ধী। স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার আগেই তাঁর হাতেখড়ি হয়েছিল সাংবাদিকতায়। সালটা ছিল ১৮৯৩। দক্ষিণ আফ্রিকায় পা রাখলেন গান্ধীজি। সেখানকার কৃষ্ণবর্ণের মানুষ ও বংশোদ্ভূত ভারতীয়দের ওপর শ্বেতাঙ্গ ইংরেজদের অত্যাচারের সাক্ষী ছিলেন তিনি। প্রতি মুহূর্তে দেখেছেন ভারতীয়দের বঞ্চিত হচ্ছে। তখন থেকেই জেগে ওঠে তাঁর প্রতিবাদী সত্ত্বা। ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে লড়তে হলে বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ভারতীদের এক করতে হবে। তাদের কাছে পৌঁছনোর জন্য যোগযোগের সহজ মাধ্যম হিসেবে তিনি বেছে নেন সংবাদপত্রকে।

১৯০৩-এর ৬ জুন তিনি যোগ দেন একটি ইংরেজি সাপ্তাহিক পত্রিকায়। য়ার নাম ইন্ডিয়ান ওপিনিয়ন। তিন তাঁর লেখনীর মাধ্যমে সমাজের কাছে পৌঁছে দিতেন তাঁর চিন্তা-ভাবনা, মানুষের দুঃখ-দুর্দশা, জনগণের আবেগ, ইংরেজদের বর্ণ বৈষম্য, বিভেদমূলক আচরণের বিরুদ্ধে করতেন প্রতিবাদও। ইংরেজি ছাড়াও ইন্ডিয়ান ওপিনিয়ন প্রকাশিত হতো তমিল, তেলেগু, গুজরাতি সহ বিভিন্ন ভাষায়। গান্ধীজির ক্ষুরধার লেখায় কিছুটা হলেও ভয় পেয়েছিল তৎকালীন দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারের। এর জেরে ভারতয়ীদের প্রতি নমনীয় হত হয়েছিল। কিছু আইনে রদবদলও ঘটানো হয়েছিল।

জীবনের ২১ টা বছর দক্ষিণ আফ্রিকায় ছিলেন গান্ধীজি। ভারতে ফেরেন ১৯১৪ তে। দেশে ফিরে স্বাধীনতার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েচিলেন সংগ্রামে। যোগ দিয়েছিলেন জাতীয় কংগ্রেসে। ১৯১৯-এ তিনি ইয়ং ইন্ডিয়া পত্রিকার সম্পাদক নিযুক্ত হন। যে পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা মুম্বাইয়ের হোমরুল লিগ। একই সময় নাজীবন নামে একটি মাসিক গুজরাতি পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্বও কাঁধে তুলে নেন গান্ধিজী। ১৯৩২ সাল পর্যন্ত পত্রিকাটি চালিয়ে নিয়ে গিয়েছিলন তিনি।গান্ধীজির একার প্রচেষ্টায় মাসিক থেকে এক সময় সাপ্তাহিকে পরিণত হয়েছিল পত্রিকাটি। গান্ধীজি মনে করতেন জনপ্রিয় সত্যি ঘটনাগুলিকে নির্ভীকভাবে প্রকাশ করাটাই সংবাদপত্রের মূল লক্ষ্য। কয়ক বছর ইয়ং ইন্ডিয়ার সম্পাদনা দক্ষতার সঙ্গে চালিয়ে নিয় যাওয়ার পর ইংরেজদের রাজ রোষে পড়েন গান্ধীজি। সেই সময় পত্রিকার কাজ থমকে দাঁড়ালেও তিনি কারমুক্ত হয়ে শুরু করেন ইংরেজি দৈনিক হরিজন। মূলত হরিজন সম্প্রদায়ের জন্য তাঁর যে সংগ্রাম তা ভোলার নয় কখনও। এর পাশাপাশি গুজরাতি ভাষায় ‘হরিজন বন্ধু’ এবং হিন্দী ভাষায় ‘হরিজন সেবক’ নামে দুটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। তিনি নিজে হরিজন পত্রিকার সম্পাদক না হয়েও এই পত্রিকার উন্নতির জন্য প্রভূত চেষ্টা করেছিলেন এবং পত্রিকাটিকে আন্দোলনের একটি অস্ত্রে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। 

বর্তমানে সংবাদপত্রগুলি বিজ্ঞাপন ছাড়া কিছু ভাবতেই পারে না। কারণ বিজ্ঞাপনই তাদের আয়র উৎস, মা লক্ষ্মী। কিন্তু গান্ধীজি ছিলেন এর ঘোরতর বিরোধী। ফলে তাঁর পত্রিকায় কোনও বিজ্ঞাপন ছাপা হতো না। তাই বলে পত্রিকা লোকসানে চলুক এটাও কাম্য ছিল না। সেই কারণে প্রচার বাড়াতে সচেষ্ট ছিলেন। সংবাদপত্র চালাতে যে অর্থের প্রয়োজন তা তিনি সংগ্রহ করতেন গ্রাহকদের কাছ থেকেই। পত্রিকর খরচ মিটিয়ে যে পরিমাণ অর্থ অবশিষ্ট থাকতো তা তিনি পুনঃরায় গ্রাহকদের ফেরত দিয়ে দিতেন নতুবা অন্য কোনও ভাল কাজে ব্যবহার করতেন। যা আজকের দিনে দাঁড়িয়ে অভাবনীয়। তিনি নিজে সংবাদপত্র থেকে কোনও অর্থ নিজের জন্য নিতেন না। সম্পূর্ন স্বেচ্ছাসেবক রূপে নিজের দায়িত্ব পালন করতেন। সরকার কর্তৃক চাপিয়ে দেওয়া কোনও নির্দেশ তাঁর কাছে ছিল না-পসন্দ। তবে সংবাদপত্র পরিচালনার ব্যপারে সরকারের সঙ্গে সরাসরি কোনও সংঘর্ষ করেননি। এক্ষেত্রেও তিনি অহিংসনীতি মেনে চলতেন। গান্ধীজি ইংরাজী সংবাদপত্রে সাংবাদিকতা মন থেকে পছন্দ না করলেও তা করতেন শুধুমাত্র অহিন্দভাষীদের জন্য। বিশেষত দক্ষিণ ভারতীয়দের জন্য। আঞ্চলিক ভাষার সংবাদপত্র প্রকাশিত হলে মানুষে নিজেকে তার সঙ্গে একাত্ম করতে পারবে বলেই মনে করতেন গান্ধীজি। ইয়ং ইন্ডিয়ার গ্রাহক সংখ্যা ছিল মাত্র ১ হাজার ২০০ জন। অন্যদিকে নবজীবন পত্রিকার প্রচার সংখ্যা ছিল ১২ হাজার। পত্রিকার গ্রাহক সংখ্যা কমপক্ষে আড়াই হাজার না হলে সম্পাদনা করতে চাইতেন না গন্ধীজি। কিন্তু পরবর্তীকালে ইয়ং ইন্ডিয়া পত্রিকার গ্রাহক সংখ্যা পৌঁছে গিয়েছিল ৪৫ হাজার। গান্ধীজির সংবাদিকতার শৈলী ছিল সোজা-সাপটা, সহজ-সরল এবং বলিষ্ঠ। তিনি বলতেন পত্রিকা একপাতার হোক, তা যেন সুন্দর ভাষায় লেখা থাকে। গান্ধীজি গুজরাতি ভাষার সাংবাদিকতায় এক নতুন জোয়ার নিয়ে এসেছিলেন। তাঁর সময় থেকেই গুজরাতি ভাষার সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকতা উন্নত হতে শুরু করে। তাঁর চিন্তা-ভাবনা, স্বাধীনতা সংগ্রামের বক্তব্য, জনগণের মধ্যে যাঁরা দুর্বল শ্রেণী তাঁদের কথা তাঁদের অর্থনৈতিক ও সামাজিকও দূরবস্থার চিত্র প্রতিফলিত হতো তাঁর লেখায়। আর সেই লেখা সপ্তাহের শেষে পৌঁছে যেত গ্রাহকদের কাছে। শোনা যায়, একবার মিস্টার জায়কার গান্ধীজিকে খাদি শিল্পের উন্নতির জন্য ২৫০০ টাকা দান করেছিলেন। কিন্তু গান্ধীজি পুরো টাকাটা ‘ইন্ডিপেন্ডেন্স’ পত্রিকার টিঁকে থাকার লড়াইয়ে দান করে দেন। মতিলাল নেহেরু ছিলেন সেই সময়ে ‘ইন্ডিপেন্ডেন্স’ পত্রিকার মালিক এবং পত্রিকাটির অবস্থা তখন একদমই ভালো ছিল না। এই ঘটনা প্রমাণ করে ভারতীয় সংবাদপত্রের উন্নতির জন্য গান্ধীজি সদাই আন্তরিক সচেষ্ট ছিলেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here