দশভূজার আবির্ভাব ও দুর্গা পুজোর প্রেক্ষাপট

0
286

পল্লবী সান্যাল : পৌরানিক কাহিনী থেক জানা যায়, মহিষাসুরের অত্যাচারের জেরে স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন দেবগণ। ব্রক্ষ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের শরীর থেকে অগ্নির ন্যায় এক তেজরশ্মি বিচ্ছুরিত হয়। তারপর তা একত্রিত হয়ে বিশাল এক আলোক পুঞ্জে পরিণত হয়। সেই আলোক পুঞ্জ থেকেই আবির্ভূতা হন দেবী দুর্গা। তাঁর দিব্য অস্ত্রে সজ্জিত আদ্যাশক্তি মহামায়া অসুরকুলকে একে একে বিনাশ করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন এই বিশ্ব ব্রক্ষ্মাণ্ডে।

ত্রিনয়নের অধিকারী হওয়ায় দেবী দুর্গা ত্রৈমাবক্যে নামে পরিচিত। তাঁর বাঁ চোখ হল বামনা তথা চন্দ্র। ডান চোখ হল কর্ম তথা সূর্য। কেন্দ্রীয় চোখ বা ঊর্ধ্বনয়ন হল জ্ঞান তথা অগ্নি।

দশ হাতের অধিকারিনী দশভূজার হাতে থাকে ১০ টি অস্ত্র। এর মধ্য একটি হল শঙ্খ ‘প্রণব’ যা ওঙ্কার ধ্বনির অর্থবহতা নির্দেশ করে। তীর ধনুক দেবীর শক্তিমত্তার প্রতীক। মায়ের হস্তে ধৃত বজ্রাগ্নি হল ভক্তের সঙ্কল্পের দৃঢ়তা। পদ্ম বা ‘পঙ্কজ’-এর অর্থ হল পদ্ম যেমন কাদামাটির ভেতর হতে অনাবিল হয়ে ফোটে, তেমনই দেবীর উপাসকরাও যেন লোভ-লালসার জাগতিক কাদার ভেতর হতে আত্মার বিকাশ ঘটাতে পারে। দেবীর তর্জনীতে ধরা সুদর্শন চক্র তাঁর শুভ্রতার লালন ও অশুভের বিনাশের ইচ্ছার প্রকাশ। মা দুর্গার হাতের তলোয়ার হল জ্ঞানের ইঙ্গিত ও ত্রিশুল সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ গুণের প্রকাশ। হিন্দু শাস্ত্র মতে, দৈত্য, বিঘ্ন, রোগ, পাপ ও ভয়-শত্রুর হাত থেকে যিনি রক্ষা করেন, তিনিই দুর্গা।

দূর্গা পজো কবে কোথায় শুরু হয়েছিল তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। তবে ইতিহাসের পাতা ওল্টালে জানা যায়, ভারতের দ্রাবিড় সভ্যতায় মাতৃতান্ত্রিক দ্রাবিড় জাতির মধ্যে মাতৃদেবীর পূজার প্রচলন ছিল। সিন্ধু সভ্যতায় (হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো সভ্যতা) দেবীমাতা, ত্রিমস্তক দেবতা, পশুপতি শিবের পূজার প্রচলন ছিল। দূর্গা শিবের অর্ধাঙ্গিনী সে হিসাবে অথবা দেবী মাতা হিসাবে পূজা হতে পারে। আবার কৃত্তিবাসের রামায়নে আছে, শ্রী রাম চন্দ্র কালিদহ সাগর (বগুড়ার) থেকে ১০১ টি নীল পদ্ম সংগ্রহ করে সাগর কূলে বসে বসন্তকালে সীতা উদ্ধারের জন্য সর্বপ্রথম শক্তি তথা দুর্গোত্‍সবের (বাসন্তি পূজা বা অকাল বোধন) আয়োজন করেছিলেন। মারকেন্দীয়া পুরান মতে, চেদী রাজবংশের রাজা সুরাথা খ্রীষ্ট্রের জন্মের ৩০০ বছর আগে কলিঙ্গে নামে দুর্গা পুজো প্রচলন করেছিল। যদিও প্রাচীন ওড়িশার সঙ্গে নেপালের পুজোর কোনও যোগসূত্র রয়েছে কিনা তা স্পষ্ট নয়।ওড়িশার রামেশ্বরপুরে একই স্থানে ৪০০ শত বছর ধরে সম্রাট আকবরের আমল থেকে দূর্গা পূজা হয়ে আসছে।

ইতিহাস বলে মধ্য যুগে বাংলা সাহিত্যে দুর্গা পুজোর অস্তিত্ব পাওয়া যায়। ১১ শতকে মৈথিলী কবি বিদ্যাপতির দুর্গাভক্তিতরঙ্গিনীতে দূর্গা বন্দনা পাওয়া যায়। ১৫১০ সালে কুচ বংশের রাজা বিশ্ব সিংহ কোচবিহারে দুর্গা পুজোর আয়োজন করেছিলেন। ১৬১০ সালে কলকাতার বারিশার রায় চৌধুরী পরিবার প্রথম দূর্গা পূজার আয়োজন করেছিল বলে ধারণা করা হয়। ১৭৯০ সালের দিকে এই পূজার আমেজে আকৃষ্ট হয়ে পশ্চিম বঙ্গের হুগলি জেলার গুপ্তি পাড়াতে বার জন বন্ধু মিলে টাকা পয়সা (চাঁদা) তুলে প্রথম সার্বজনীন ভাবে আয়োজন করে বড় আকারে দুর্গোৎসব। যা বারোইয়ার বা বারবন্ধুর পূজা নামে ব্যাপক পরিচিতি পায়।

১৯১০ সালে সনাতন ধর্মউত্‍সাহিনী সভা ভবানীপুরে বলরাম বসু ঘাট লেনে এবং একই জেলায় অন্যান্যরা রামধন মিত্র লেন, সিকদার বাগানে একই বছরে ঘটা করে প্রথম বারোয়ারী পুজার আয়োজন করে।
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে দুর্গা স্বাধীনতার প্রতীক হিসাবে জাগ্রত হয়। বিংশ শতাব্দির প্রথমার্ধে এই পুজো ঐতিহ্যবাহী বারোয়ারী বা কমিউনিটি পুজো হিসাবে জনপ্রিয়তা লাভ করে। আর স্বাধীনতার পর এই পুজো পৃথিবীর অন্যতম প্রধান উত্‍সবের মর্যাদা পায়।

বাংলাদেশের সাতক্ষীরার কলারোয়ার ১৮ শতকের মঠবাড়িয়ার নবরত্ন মন্দিরে (১৭৬৭) দুর্গা পুজো হত বলে লোকমুখে শোনা যায়। ঢাকেশ্বরী মন্দির চত্বরে রয়েছে দুই ধরনের স্থাপত্যরীতি মন্দির। প্রাচীনতমটি পঞ্চরত্ন দেবী দুর্গার যা সংস্কারের ফলে মূল চেহেরা হারিয়েছে। মন্দিরের প্রাচীন গঠনশৈলী বৌদ্ধ মন্দিরের মত। মনে করা হয়, দশম শতকে এখানে বৌদ্ধ মন্দির ছিল যা পরে সেন আমলে হিন্দু মন্দির হয়েছিল এবং ১১শ বা ১২শ শতক থেকে এখানে কালী পূজার সাথে দুর্গা পুজোও হত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here