জেনে নিন দীপান্বিতা লক্ষ্মীপুজোর ইতিহাস….

0
41

নিজস্ব প্রতিবেদন (দেবস্মিতা ঘোষ)১০.১১.২০২০

কথায় বলে, বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। পয়লা বৈশাখে গণেশপুজো-হালখাতা দিয়ে সূচনা আর চৈত্র সংক্রান্তির গাজনে সমাপ্তি। সেই অনুসারে সারা বছরেই নানা পুজো-পার্বণ থাকলেও বাংলার প্রকৃত উৎসবের মরশুম আরম্ভ হয় দুর্গাপুজো দিয়ে আর শেষ কালীপুজোতে। তিথি নক্ষত্রের হিসেবে আশ্বিন-অমাবস্যা (মহালয়া) থেকে কার্তিক-অমাবস্যা (কালীপুজো)— এই এক মাস কাল হল বাংলার প্রধান উৎসবের মরশুম। দুর্গাপুজো শেষ হলে আসে লক্ষ্মীপুজো এবং তার পরে কালীপুজো তথা দীপাবলি।

দীপাবলি আদতে আলোর উৎসব। বিশ্বের বিভিন্ন ধর্মের মধ্যেই এক ধরনের আলোক উৎসবের কথা বলা আছে। তারই একটি হল হিন্দু তথা ভারতীয় সংস্করণ, দীপাবলি। এই উৎসবে  পুজোর থেকেও বেশি উল্লেখযোগ্য হল দীপমালার সজ্জা। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভারতীয় সংস্কৃতির নানা কাহিনি, যেগুলির সঙ্গে কালীর থেকেও বেশি সম্পর্ক লক্ষ্মীর।

প্রচলিত বিশ্বাস হল— কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশী তিথিতেই সমুদ্র থেকে ধন্বন্তরী উঠে এসেছিলেন। তাই এই তিথির নাম ধন্বন্তরি ত্রয়োদশী বা সহজ কথায় ধনতেরাস। সে জন্য এই দিন ধনের উপাসনা করতে হয় আর ওই দিন একই সঙ্গে দেবী লক্ষ্মীও সমুদ্র থেকে উঠে আসেন বলে লক্ষ্মীর আরাধনাও করা হয়। লক্ষ্মী পুরাণ অনুযায়ী স্বর্গে ফিরে গেলেন, কার্তিক-অমাবস্যায়। তাই লক্ষ্মীর স্বর্গে ফেরা উপলক্ষে স্বর্গকে সাজিয়ে তোলা হয়েছিল আলোকমালায়। আর একটি কাহিনি অনুসারে, লঙ্কা বিজয় সেরে সীতা ও লক্ষ্মণকে নিয়ে রামচন্দ্র যে দিন অযোধ্যায় ফেরেন, তিথি হিসেবে সেটি ছিল ওই কার্তিক-অমাবস্যা। ভগবান বিষ্ণুর সপ্তম অবতার রামের লীলাসঙ্গিনী লক্ষ্মীদেবীকে বরণ করে নেওয়ার জন্য সেই রাতে অযোধ্যা নগরীকে সাজানো হয়েছিল অগণ্য দীপমালায়। অন্য এক কাহিনি আবার বলে, কার্তিক-চতুর্দশীতে কৃষ্ণ নরকাসুরকে বধ করে তার কারাগারে বন্দি ১৬ হাজার গোপিনীকে মুক্ত করেন। সেই উপলক্ষে, পরের দিন অর্থাৎ কার্তিক-অমাবস্যাতে আলোকমালা সাজিয়ে উৎসব হয়েছিল। দীপাবলিতে দীপ জ্বালানো নিয়ে এমন হরেক কাহিনি প্রচলিত আছে হিন্দু পুরাণ-শাস্ত্রগুলিতে।

শৈব (শিবের উপাসক), বৈষ্ণব (বিষ্ণুর উপাসক), শাক্ত (শক্তির উপাসক), গাণপত (গণেশের উপাসক), সৌর্য (সূর্যের উপাসক)— ভারতীয় হিন্দু ধর্মের এই পাঁচ উপ-বিভাগের অন্যতম শাক্তদের প্রাধান্য পূর্ব ভারতেই বেশি। প্রাচীন কাল থেকেই বাংলায় এই ধারা চলে আসছে। বাংলার উৎসব মরশুমে এই শক্তি আরাধনাই হয় দুর্গা ও কালীপুজোর মধ্যে দিয়ে। কিন্তু মধ্যযুগে চৈতন্যদেব প্রবর্তিত গৌড়ীয় বৈষ্ণব ভাবধারার প্রাধান্যও লক্ষ করা যায় বাংলার শক্তি আরাধনার ক্ষেত্রে। দেবীপক্ষের শেষ দিন অর্থাৎ আশ্বিনের শুক্লপক্ষের পূর্ণিমায় হয় কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো। আর তার পনেরো দিন পরে কার্তিক-অমাবস্যায় দীপাবলীর দিন হয় কালীপুজো। হিন্দু পুরাণ-শাস্ত্র অনুসারে দেবী কালিকা দুর্গারই আর এক রূপ। শক্তির উপাসকেরা দীপাবলীর দিন কালীপুজো করেন আর সে দিন সারা ভারত জুড়ে বিষ্ণুর উপাসকেরা আরাধনা করেন মহালক্ষ্মীর। বঙ্গদেশেও তার ব্যতিক্রম হয় না। কালীপুজোর রাতে দীপান্বিতায় অলক্ষ্মী বিদায় ও মহালক্ষ্মীর পুজো দিয়ে সূচনা হয় পশ্চিমবঙ্গীয়দের কার্তিক, পৌষ, চৈত্র ও ভাদ্র মাসের লক্ষ্মী পুজোর। এমনকী বাংলার অন্যতম প্রাচীন শক্তিপীঠ মহাতীর্থ কালীঘাট মন্দিরে এই কার্তিক-অমাবস্যায় দীপান্বিতা মহালক্ষ্মীর পুজো করেন হালদার বংশীয় সেবাইতরা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here