গণেশের পেটে গণেশ! ব্যতিক্রমী এই রীতি কোথায় দেখা যায়?

0
1145

পল্লবী সান্যাল : জন্মাষ্টমী, নন্দোৎসব পেরিয়ে শুরু হয় দেবী দুর্গার কাঠামো পুজো। সেই সময় একটি ছোট গণেশের মূর্তি বাননো হয়। যতদিন না প্রতিমা নির্মাণ সম্পূর্ণ হয় ততোদিন পর্যন্ত পুজো পায় মাটির তৈরি গণেশ। মা দুর্গা ও তার চার ছেলে মেয়ের প্রতিমা গড়ার কাজ সম্পূর্ণ হলে গণেশের পেটের ভেতর ঢুকে যায় মাটির তৈরি ছোট গণেশটি। বছরের পর বছর ধরে এমনই এক ব্যতিক্রমী রীতি পালিত হয়ে আসছে উত্তর কলকাতার লাহা বাড়িতে।

কে প্রথম লাহা বাড়িতে দুর্গা পুজো শুরু করেছিলেন তা নিয়ে নানা মুনির নানা মত রয়েছে। কলকাতার ইতিহাসে লাহা বাড়ির পুজোর বয়স বছরেরও বেশি। শোনা যায়, এক সময় ‘ল’ অর্থাৎ আইন বাড়ি হিসেবেই পরিচিত ছিল এই বাড়ি। পরবর্তীকালে মানুষজন ‘ল’ কে লাহা বলে ডাকতে শুরু করলে তা লাহা বাড়ি হয়ে ওঠে। কেউ বা বলে, লাহা বাড়ির পুজোর বয়স সাড়ে ৩০০ বছর। প্রতিষ্ঠাতা বর্ধমানের বনমালী লাহা। পরবর্তীতে চূঁচূড়ার বাড়িতে পুজো শুরু করেন মধুমঙ্গল লাহা। সেই পুজোর বয়সও দেখতে দেখতে ২৩০ বছর হয়ে গেল। এরপর দুর্গাচরণ লাহার সৌজন্যে ১৭০ বছর আগে পুজো শুরু হয় কলকাতায়। কেউ বা আবার বলেন যে ২০০ বছর আগে লাহা বাড়ির পূর্ব পুরুষ রাজীবলোচন লাহা স্বপ্নাদেশ পেয়ে পুজো শুরু করেন। সবমিলিয়ে মোট চার জায়গায় পালা করে লাহা বাড়ির দুর্গোতসব হয়। বিধান সরণিতে কৃষ্টদাস লাহার বাড়ি, মুক্তরামবাবু স্ট্রিটে রামচরণ লাহার বাড়ি, কৈলাশবোস স্ট্রিটে জয়গোবিন্দ লাহার বাড়ি আর বেচু চ্যাটার্জি স্ট্রিটে পার্বতীচরণ লাহার বাড়ি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পুজোর পালা পড়ে। প্রতি বছর কোনও একটি পরিবারের ওপর দায়িত্ব পড়ে পুজো সম্পন্ন করার।

লাহা বাড়ির পুজো হয় বৈষ্ণব মতে। দেবী প্রতিমা একচালার। তবে দেবী দুর্গা এখানে মহিষাসুর মর্দ্দিনী রূপে পূজিতা হন না। পূজিতা হন হর গৌরি পাশাপাশি। মহাদেবের কোলে দেবী দুর্গা উপবিষ্টা। শিবের বাহন ষাঁড়। লক্ষ্মী সরস্বতী কার্তিক গণেশ আছেন তাঁর দুইপাশে। দেবীর দুই হাত এবং তাতে কোনও অস্ত্র নেই। লাহা পরিবারের কুলদেবী অষ্টধাতুর সিংহবাহিনী মূর্তি জয়জয় মা। জানা যায়, লাহা পরিবারের তখনও তত খ্যাতি ঐশ্বর্য হয়নি। সেই সময় নাকি দেবীর এই মূর্তি কোনও এক গভীর জঙ্গলে ডাকাতদের হাতে লাঞ্ছিত হয়ে অনাদরে অযত্নে পড়ে ছিল। বাড়ির এক সদস্য দেবীর কাছে স্বপ্নাদেশ পেয়ে মূর্তি উদ্ধার করতে গিয়ে দেখেন, দেবী বড় বিপন্ন। তিনি যত্নে দেবীকে তুলে নিয়ে এসে  কুলদেবী রূপে পুজো করতে শুরু করেন। তারপর থেকেই লাহাদের প্রভূত উন্নতি হয়।  পুজোর সময় মূর্তি রূপোর সিংহাসন সহ ঠাকুর ঘর থেকে নিয়ে এসে হরপার্বতীর সামনে প্রতিষ্ঠা করা হয়। সেখানে দুই দেবী মূর্তির একই সঙ্গে পুজো হয়। পুজো শেষে বিসর্জনের আগে জয়জয় মা কে ঠাকুর ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়।

দেবীপক্ষের শুরুতে বোধন দিয়ে পুজো শুরু হয লাহা বাড়িতে। পঞ্চমীর দিন সকালে  চাল ডাল তেল চিনি মশলা মধু রান্নার সব উপকরণ ডালাতে সাজিয়ে দেবীকে নৈবেদ্য দেওয়া হয়। একে বলে ‘রচনা। ষষ্ঠীর দিন হয় কল্পনা আর অধিবাস। এই দিন ঠাকুরকে গয়না আর অস্ত্রে সাজিয়ে দেওয়া হয়। কার্তিকের যাবতীয় অস্ত্র , লক্ষ্মীর ঝাঁপি, পেঁচা, গণেশের শঙ্খ , চক্র , গদা , পদ্ম , মা সরস্বতীর বীনা, শিবঠাকুরের মাথায় সাপ এগুলি সবই রূপোর এই বাড়িতে। মহালয়ার দিন থেকে বাড়িতে ভিয়েন বসে। এই সময় থেকেই  মিষ্টি তৈরি শুরু হয় বাড়িতে। নানা রকম নাড়ু এই বাড়ির ভোগের বৈশিষ্ট্য। তিলের নাড়ু , নারকেলের নাড়ু সুজির নাড়ু, বেসনের নাড়ু, মেওয়া চিনি ক্ষীর আর বাটার স্কচ  ফ্লেভার দিয়ে দিয়ে তৈরি বিশেষ এক ধরণের নাড়ু এছাড়া আছে খাজা, পান গজা , চৌকো গজা , কুচো গজা , এলোঝেলো তো আছেই। সবমিলিয়ে প্রায় ২১ রকমের মিষ্টি বাড়িতে তৈরি হয়। পঞ্চমীর দিন পর্যন্ত চলে এই পর্ব।

বৈষ্ণব মতে পুজো হওয়ায় লাহা বাড়িতে অন্নভোগ হয় না। পুজোতে পশুবলিও হয় না। কুমড়ো আর শশা বলি দেওয়া হয়। সপ্তমীতে জয়া মা নাটমন্দিরে প্রবেশ করেন। অষ্টমীর পুজোর পরে ধুনো পোড়ানো হয়। বাড়ির মহিলারা দুই হাতে আর মাথার ওপরে  সরায় জ্বলন্ত ধুনো নিয়ে ঠাকুর দালানে বসেন। নবমীর দিন দেবীকে ‘কোল হাড়ি’ দেওয়া হয়। দেবীর কাছে খই মুড়কি মিষ্টি  ছোট্ট একটা হাড়িতে ভরে উৎসর্গ করা হয়। পুজোর পর বাড়ির মহিলারা গৃহের মঙ্গলার্থে এগুলি নিয়ে যে যার বাড়িতে নিয়ে যান।

দশমীর দিন বেলপাতায় দুর্গানাম লেখার রীতি রয়েছে, আর তা লেখেন বাড়ির ছেলেরা। দশমীর অঞ্জলিও তাঁরাই দেন। মেয়েরা এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন না। বিসর্জনের প্রথাও অন্য বাড়ি থেকে আলাদা এই বাড়িতে। এদিন বিশেষ এক আচার রয়েছে লাহা বাড়িতে. কোনও যানবাহনে নয় পুরনো ঐতিহ্য মেনে লাহা বাড়ির দেবীকে আজও কুলিরা কাঁধে ঝুলিয়ে বিসর্জনে নিয়ে যান। যেই মাত্র দেবী বাড়ির মূল দরজা পার হন, ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেন বাড়ির মেয়েরা। বিসর্জন দিয়ে ফিরে বাড়ির পুরুষরা জিজ্ঞাসা করেন, ‘মা আছেন ঘরে’ ? তখন বাড়ির কোনও মহিলা ভিতর থেকে  উত্তর দেন, ‘হ্যাঁ মা আছেন।‘ বাইরে থেকে ফের জিজ্ঞাসা করা হয় ‘মা আছেন ঘরে ?’ একই উত্তর দেওয়া হয় ভিতর থেকে। এভাবে পরপর তিনবার জিজ্ঞাসা করা হয়। এরপরই মূল দরজা খুলে পুরুষরা প্রবেশ করেন বাড়িতে। কথিত রয়েছে, এই পরিবারের চতুর্থ পুরুষ দুর্গাচরণ লাহা একবার প্রতিমা নিরঞ্জনের পরে গঙ্গায় মুখ হাত ধুচ্ছিলেন। সেই সময় একটি ছোট মেয়ে তাঁর কাছে বারে বারে ভিক্ষা চাইতে থাকে। বিরক্ত হয়ে দুর্গাচরণ মেয়েটিকে সেই মুহূর্তে সরে যেতে বলেন। পরে যখন তিনি ভিক্ষা দিতে যান তখন আর মেয়েটিকে খুঁজে পাননি। বাড়ি ফিরে দেখেন বাড়ির দরজা খোলা। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছিল যে মেয়েটি ভিক্ষা চাইতে এসেছিল তিনি ছদ্মবেশে মা দুর্গা ছিলেন। অনাদর সহ্য করতে না পেরে তিনি ফিরে যান। তারপর থেকে পরম আদরে দুর্গাকে এ বাড়িতে নিয়ে আসা ও বিসর্জন দেওয়া হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here