স্বর্গের কারিগর বিশ্বকর্মা ….

0
197

নিজস্ব প্রতিবেদন(মৌটুসি রায়)১৫/৯/২০: শিল্পী ও নির্মাতাদের দেবতা বিশ্বকর্মা। ব্রহ্মাপুত্র বিশ্বকর্মাই গোটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নকশা তৈরি করেন। ঈশ্বরের প্রাসাদের নির্মাতাও বিশ্বকর্মা। দেবতাদের রথ ও অস্ত্রও তৈরি করেছিলেন এই বিশ্বকর্মাই। মহাভারত অনুযায়ী বিশ্বকর্মা হলের শিল্পকলার দেবতা, সকল দেবতার প্রাসাদ, সকল প্রকার অলঙ্কারের নির্মাতা।


বিবরণ অনুযায়ী তাঁর চার বাহু, মাথায় রাজার মুকুট, হাতে জলের কলস, বই, দড়ির ফাঁস ও অপর হাতে একটি যন্ত্র। ওঁ দংশপালঃ মহাবীরঃ সুচিত্রঃ কর্মকারকঃ। বিশ্বকৃৎ বিশ্বধৃকতঞ্চ বাসনামানো দণ্ডধৃক।। ওঁ বিশ্বকর্মণে নমঃ। ধ্যান ও প্রনাম মন্ত্র অনুসারে দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার যে চিত্র পাওয়া যায়- তাতে তিনি একাধারে মহাবীর ও দয়াদি অষ্টগুন যুক্ত । তিনি সৃষ্টির নির্মাতা ও ধাতা । তিনি মান দণ্ড ধারী মহাশিল্পী। আবার তিনি মহাযোদ্ধা।
ঋক্ বেদের দশম মণ্ডলের দুটি সুক্তে ( ৮১, ৮২) বিশ্বকর্মার স্তুতি পাওয়া যায়। সেই ভাবার্থ অনুসারে – দ্যুলোক ও ভূলোক উভয়ই প্রথমে জলাকার ও সম্মিলিত ছিল। ক্রমে উভয়েরই চতুঃসীমা যতই বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় তারা পরস্পর দূরবর্তী হতে হতে ক্রমে সম্পূর্ণ পৃথক হয়ে যায় । সুধীর বিশ্বকর্মা মনে মনে চিন্তা ও উত্তম রূপে নিরীক্ষণ করে এই বিরাট সৃষ্টি চক্র প্রবর্তন করেন। এই বিশ্ব তাঁরই কর্ম বলে তিনি বিশ্বকর্মা। বেদে যিনি মুখ্যতঃ বিশ্বস্রষ্টা , পুরানে তাঁকে দেখি দেবশিল্পী হিসাবে। তিনি “কর্তা শিল্প সহস্রাণাম” অর্থাৎ তিনি সহস্র শিল্পের অধিকর্তা। তিনি “দেবানাং কার্য্যসাধকঃ” অর্থাৎ দেবতাদের শিল্পের কার্য্য সাধক। বিশ্বকর্মার জন্ম বিষয়ে পুরানে নানা আখ্যানের অবতারনা করা হয়। কোনো পুরান মতে তাঁর জন্ম অষ্টবসুর অন্যতম প্রভাসের ঔরসে দেবগুরু বৃহস্পতির ভগিনী বরবর্ণিনীর গর্ভে। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরান মতে প্রজাপতি ব্রহ্মার নাভিদেশ থেকে বিশ্বকর্মার উৎপত্তি বলে লেখা আছে। বেদে এই বিশ্বকর্মাকে অজাত পুরুষ বা সনাতন পুরুষ রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। বিশ্বকর্মা নানান শিল্প রচনা করেন। কুবেরের মহল, স্বর্গের দেবসভা, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দ্বারকা পুরী, জগন্নাথের বিগ্রহ, রাবনের স্বর্ণ লঙ্কা, ভগবান শিবের ধনুক, ত্রিশূল- সব এঁনার সৃষ্টি। এছাড়া মার্কণ্ড পুরানে দেখতে পাই ইনি দেবীকে অভেদ্য কবচ, পরশু ও নানান অস্ত্র প্রদান করেছিলেন। বিশ্বকর্মার হস্তে দাঁড়িপাল্লা থাকে। দাঁড়িপাল্লার দুটি পাল্লা জ্ঞান ও কর্মের প্রতীক। উভয়ের সমতা বজায় রেখেছেন তিনি। এছাড়া তিনি হাতুরী ধারন করেন- যা শিল্পের সাথে জড়িত। তিনি যে শিল্পের দেবতা।

হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী বিশ্বকর্মা দেবতাদের শিল্পী। তিনি দেবশিল্পী নামে পরিচিত। বৃহস্পতির ভগিনী যোগসিদ্ধা তাঁর মাতা এবং অষ্টম বসু প্রভাস তাঁর পিতা। বিশ্বকর্মার বাহন হাতি। বিশ্বকর্মা বৈদিক দেবতা, ঋগবেদের ১০ম মণ্ডলে ৮১ এবং ৮২ সূক্তদ্বয়ে বিশ্বকর্মার উল্লেখ আছে। ঋগবেদ অনুসারে তিনি সর্বদর্শী এবং সর্বজ্ঞ। তাঁর চক্ষু, মুখমণ্ডল, বাহু ও পদ সবদিকে পরিব্যাপ্ত। তিনি বাচস্পতি, মনোজব, বদান্য, কল্যাণকর্মা ও বিধাতা অভিধায় ভূষিত। তিনি ধাতা, বিশ্বদ্রষ্টা ও প্রজাপতি। বিশ্বকর্মার কিছু অমর সৃষ্টি – হিন্দু পুরাণ জুড়ে রয়েছে বিশ্বকর্মার বিভিন্ন নির্মাণ।

সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর, কলি-চার যুগ ধরে ছড়িয়ে রয়েছে বিশ্বকর্মার অমর কীর্তিরা। সত্যযুগে বিশ্বকর্মা তৈরি করেছিলেন স্বর্গলোক। এই প্রাসাদ থেকেই দেবরাজ ইন্দ্রের মর্ত্যলোক শাসন করতেন। ত্রেতা যুগে বিশ্বকর্মা সৃষ্টি করেন সোনার লঙ্কা। দ্বাপর যুগে সৃষ্টি করেন দ্বারকা। কলিযুগে বিশ্বকর্মার অমর সৃষ্টি হস্তিনাপুর ও ইন্দ্রপ্রস্থ। সোনার লঙ্কা – হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী ত্রেতা যুগে রাবণ রাজার রাজধানী ছিল সোনার লঙ্কা। পার্বতীর সঙ্গে বিয়ের পর মহাদেব প্রাসাদ নির্মাণের ভার দেন বিশ্বকর্মাকে। স্বর্ণপ্রাসাদ নির্মাণ করেন বিশ্বকর্মা। গৃহপ্রবেশের পুজোর জন্য রাবণ রাজাকে আমন্ত্রণ জানান মহাদেব। পুজোর পর দক্ষিণা স্বরূপ মহাদেবের কাছে স্বর্ণলঙ্কা চান রাবণ। রাবণের হাতে স্বর্ণলঙ্কা তুলে দেন মহাদেব। সেই থেকেই রাবণের রাজধানী স্বর্ণলঙ্কা। দ্বারকা – দ্বাপর যুগে শ্রীকৃষ্ণের রাজধানী দ্বারকা বিশ্বকর্মার অমর সৃষ্টি। মহাভারতে দ্বারকাই কৃষ্ণের কর্মভূমি হিসেবে উল্লিখিত। হিন্দুদের অন্যতম দর্শনীয় ও পূজনীয় শহর দ্বারকা। হস্তিনাপুর – কলিযুগে কৌরব ও পাণ্ডবদের রাজধানী হস্তিনাপুর ও ইন্দ্রপ্রস্থও নির্মাণ করেন বিশ্বকর্মা। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পর ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে হস্তিনাপুরে অভিষিক্ত করেন কৃষ্ণ। ইন্দ্রপ্রস্থ – পাণ্ডবদের শহর ইন্দ্রপ্রস্থও নির্মাণ করেছিলেন এই বিশ্বকর্মাই। পাণ্ডবদের থাকার জন্য এক টুকরো জমি দিয়েছিলেন ধৃতরাষ্ট্র। সেই খাণ্ডবপ্রস্থে ভাইদের সঙ্গে থাকতেন যুধিষ্ঠির। পরে খাণ্ডবপ্রস্থে রাজধানী নির্মাণের জন্য বিশ্বকর্মাকে আমন্ত্রণ জানান কৃষ্ণ। তৈরি হয় ইন্দ্রপ্রস্থ। এই ইন্দ্রপ্রস্থ ছিল মায়ানগরী। প্রাসাদের মাটি দেখলে মনে হত যেন স্বচ্ছ্ব জল টলটল করছে। পুকুরের স্বচ্ছ্ব জলের মধ্যে দিয়ে আয়নার মতো চকচক করতো মাটি। প্রাসাদ তৈরির পর পাণ্ডবদের নিমন্ত্রণ রক্ষায় ইন্দ্রপ্রস্থে যান কৌরবরা। মায়ানগরীর মায়া বুঝতে না পেরে পুকুরের জলে পড়ে যান দুর্যোধন। তাকে পড়ে যেতে দেখে হেসে উঠেছিলেন দ্রৌপদী। অন্ধ বাবার অন্ধ ছেলে বলে দুর্যোধনকে অপমান করেন দ্রৌপদী। এই ঘটনা থেকেই সূত্রপাত কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের। বিশ্বকর্মা বিশ্বভুবন নির্মাণ করেন। বিষ্ণুর সুদর্শন চক্র, শিব এর ত্রিশূল, কুবের এর অস্ত্র, ইন্দ্রের বজ্র, কার্তিকেয়র শক্তি প্রভৃতি তিনি তৈরি করেছেন। শ্রীক্ষেত্রর প্রসিদ্ধ জগন্নাথ মূর্তিও তিনি নির্মাণ করেছেন।

বিশ্বকর্মা পূজা হিন্দুদের একটি ধর্মীয় উৎসব। দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার আশিস কামনায় এ পূজা অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্বকর্মা চতুর্ভুজ ও গজারূঢ়। তাঁর আকৃতি অনেকটা কার্তিকের মতো। ভাদ্রমাসের সংক্রান্তির দিন বিশ্বকর্মার পূজা করা হয়। কলকারখানায় বেশ আড়ম্বরের সঙ্গে বিশ্বকর্মার পূজা অনুষ্ঠিত হয়। অন্যান্য দেব-দেবীর মতোই মূর্তি গড়ে অথবা ঘটে-পটে বিশ্বকর্মার পূজা করা হয়।

সূতার-মিস্ত্রিদের মধ্যে এঁর পূজার প্রচলন সর্বাধিক। তবে বাংলাদেশে স্বর্ণকার, কর্মকার এবং দারুশিল্প, স্থাপত্যশিল্প, মৃৎশিল্প প্রভৃতি শিল্পকর্মে নিযুক্ত ব্যক্তিগণও নিজ নিজ কর্মে দক্ষতা অর্জনের জন্য বিশ্বকর্মার পূজা করে থাকেন। এ সময় প্রত্যেকের ঘরে বিশেষ খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা হয় এবং কোথাও কোথাও পূজার পরে ঘুড়ি ওড়ানো হয়। সমগ্র ভারতবর্ষে নয়, বিশ্বকর্মা পুজো মূলত অসম, পশ্চিমবঙ্গ, রাজস্থান, উত্তরাখণ্ড (দেরাদুন)-এর কিছু কিছু অঞ্চলে পালিত হয়।

ভারতবর্ষের বিশ্বকর্মা একটি দলিত সম্প্রদায়ের নাম, বিশ্বকর্মা সেই সম্প্রদায়ের আদিম-সভ্য পুরুষ।। বিশ্বকর্মা পিছিয়ে-পড়া এক জনজাতির ঐতিহাসিক এবং অপ্রতিরোধ্য প্রতিভার বিরল দৃষ্টান্তবিশেষ। বিশ্বকর্মা যে শুধু কর্মে সুদক্ষ তা নয়, তিনি বেশ কিছু গ্রন্থও লিখে রেখে গেছেন উত্তরসূরীদের জন্য। এবার আলোচনা করব বিশ্বকর্মার লেখক-প্রতিভা এবং লেখালেখি বিষয়ে। বিশ্বকর্মার রচিত স্থাপত্যশিল্প বিষয়ক গ্রন্থটির নাম “বাস্তুশাস্ত্রম”। “মানসার” এবং “ময়মতম” গ্রন্থে বস্তু ও বাস্তু শব্দদুটিকে সমার্থক হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। ‘বস্তু’ শব্দ থেকে ‘বাস্তু’ কথাটা এসেছে। ‘বাস্তু’ শব্দের অর্থ পৃথিবী। ব্যাপক অর্থে সমস্ত প্রাণীর আবাসস্থলই বাস্তু। অর্থাৎ, স্রষ্টার যে-কোনো সৃষ্টিই বাস্তু। কাজেই শুধু পরিকল্পিত মনুষ্যগৃহই নয়, দেবতা থেকে শুরু করে পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীর আবাসকেই বাস্তু বলে। বাস্তুশাস্ত্রে বাস্তু শব্দের অর্থ ব্যাপক।

এই শিল্পকে নির্মাণ শিল্পকে না-বুঝিয়ে পরিকল্পনা, নির্মাণ, চিত্র, অলংকরণ, স্বর্ণ-চর্ম-বয়নশিল্প, অস্ত্রশিল্প, পোতনির্মাণ, মূর্তিনির্মাণ প্রভৃতি ক্ষেত্রে পরিব্যাপ্ত আছে। পুরাণে উল্লেখ আছে, চারটি বেদের মতো চারটি উপবেদও আছে। উপবেদগুলি হল আয়ুর্বেদ, ধনুর্বেদ, গান্ধর্ববেদ এবং স্থাপত্যবেদ। এই উপবেদ স্থাপত্যবিদ্যা বা বাস্তুবিদ্যার রচয়িতা হলেন বিশ্বকর্মা। বলা হয় তিনি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রধান বাস্তুকার। তাঁর রচিত অন্তত দশখানি পুথি এ পর্যন্ত পাওয়া গেছে। অন্যদিকে মৎস্যপুরাণের ২৪২ থেকে ২৪৭ অধ্যায়, অগ্নিপুরাণের ১০৪ থেকে ১০৬ অধ্যায়, গরুড়পুরাণের ৪৬ থেকে ৪৭ অধ্যায়, ভবিষ্যপুরাণ, বিষ্ণুধর্মোত্তর পুরাণের তৃতীয় খণ্ড, বিভিন্ন আগম, শুক্রনীতিসারের চতুর্থ অধ্যায়, বৃহসংহিতা, গৃহ্যসূত্র, অর্থশাস্ত্র প্রভৃতিতে বাস্তুশাস্ত্রের আলোচনা পাই। ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে মহামহোপাধ্যায় গণপতিশাস্ত্রী বাস্তুবিদ্যা বা বাস্তুশাস্ত্রম গ্রন্থটি আবিষ্কার করে মুদ্রিত করেন। বিশ্বকর্মার নামে প্রচলিত বাস্তুশাস্ত্রটির নাম “বিশ্বকর্মাবাস্তুশাস্ত্রম”। আর্যাবর্তের শিল্পধারা বিশ্বকর্মার দ্বারা প্রবর্তিত বলে মনে করা হয়। বিশ্বকর্মার “বাস্তুশাস্ত্রম”-এর প্রথমেই বলা হয়েছে, জগতের কল্যাণ কামনায় এই শাস্ত্র প্রচার করছেন – “বাস্তুশাস্ত্রং প্রবক্ষ্যামি লোকানাং হিতকাম্যয়া”। বিশ্বকর্মার নামে এরকম গ্রন্থ অন্ততপক্ষে দশটি পাওয়া গেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here